সেপ্টেম্বর ২৪, শুক্রবার, ২০২১

হীরামন

একটি অনুজ অনলাইন ম্যাগাজিন(০ থেকে ১৭ বছরের শিশু-কিশোরদের জন্য )

শেয়ালের ধোঁকা

হীরামন ম্যাগাজিনের কাছের ও দূরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, কেমন আছো তোমরা? আশা করি যে যেখানে আছো ভাল ও সুস্থ আছো। তোমরা নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছো, আমাদের সমাজে এমন কিছু মানুষ আছে যারা প্রতারণা, ধোঁকাবাজি ও কপটতার মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করে। কিন্তু তারা জানে না যে, কপটতা বা ধোঁকাবাজি হচ্ছে এমন এক ঘৃণ্য কাজ যা মানুষের সম্মান ও মর্যাদাকে হুমকির সম্মুখীন করে। পবিত্র কোরআনে কপট লোকদের ব্যাপারে বলা হয়েছে, “তারা আল্লাহ ও ঈমানদারদেরকে ধোঁকা দিতে অথচ তারা বুঝতে পারে না যে, তারা নিজেদের ছাড়া অন্য কাউকে ধোঁকা দেয় না।”

কপটতাকে একটি আত্মিক রোগ হিসেবে আখ্যায়িত করে আমিরুল মোমেনীন হযরত আলী (আ.) বলেছেন, “কপটতাপূর্ণ লোকদের ব্যাপারে সতর্ক হও। কেননা তারা ভুলপথে পরিচালিত। তারা বিভ্রান্ত, তাদের অন্তর রুগ্ন এবং তাদের চেহারা অপবিত্র।” তিনি আরো বলেছেন, ‘সবচেয়ে নিকৃষ্ট ধরনের বিশ্বাসঘাতক হচ্ছে সেই ব্যক্তি যে তার ঘনিষ্ঠ ও ঈমানদার বন্ধুকে প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণা করে এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে।’ বিশ্বাসঘাতকদের পরিণতি সম্পর্কে তিনি বলেছেন, “বিশ্বাসঘাতকতা করো না কেননা, এটা নিকৃষ্টতম পাপ কাজ। বিশ্বাসঘাতকরা অবশ্যই দোজখের আগুনে জ্বলবে।”

বিশ্বাসঘাতক, কপট বা প্রতারকদের ব্যাপারে সতর্ক থাকার কথা বলা হলেও এ ধরনের লোকরা ধর্মের বাণী শুনতে চাই না। তারা মানুষকে নানাভাবে ধোঁকা দিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে চায়। তাদের ধোঁকার কবলে পড়ে অনেক সরজ-সরল মানুষ নানা ধরনের হয়রানী ও ক্ষতির সম্মুখীন হয়। তবে, কেবল মানুষই নয়, পশু-পাখির মধ্যেও প্রতারণা, কপটতা ও জুলুম নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। রংধনু আসরে আমরা এ সম্পর্কেই একটি গল্প প্রচার করেছি। গল্প শেষে রয়েছে একটি গানসহ বাংলাদেশের এক ছোট্ট বন্ধুর সাক্ষাৎকার।

এক বাগানে এক মোরগ বাস করতো। সে গল্প বলতে ও শুনতে পছন্দ করতো। কবুতর ও চড়ুই পাখিদের দেখলেই মোরগ বিভিন্ন বিষয় জানতে চাইতো। তারাও মোরগের ডাকে সাড়া দিতো এবং গোল হয়ে বসে গল্প বলতো। মোরগের ওপর শিয়াল ও শিকারীর আক্রমণ এবং তাদের বিভিন্ন ধোঁকা সম্পর্কে তারা আলোচনা করতো। এসব আলোচনা শুনতে শুনতে মোরগ শত্রুর চক্রান্ত সম্পর্কে সব সময় সজাগ থাকতো।

বসন্তের কোন এক একদিন মোরগ ছিল একা। সে ঘর থেকে উঁকি দিয়ে নানারকম ফুল, ফল এবং অঙ্কুরিত লতাগুল্ম দেখছিল। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর ফুলের গন্ধে তার মন আনন্দে নেচে উঠলো এবং মনের অজান্তেই উচ্চস্বরে ডাক দিতে শুরু করলো।

ওই বাগানের কাছেই ছিল একটি শিয়াল। মোরগের ডাক শোনার পর সে দৌড়ে মোরগের কাছে এলো।

মোরগকে গোশত খাওয়ার জন্য সে একটা ফন্দি আঁটলো। কিন্তু শিয়াল মোরগের কাছে পৌঁছার সাথে সাথে মোরগ প্রাণভয়ে একটি গাছের ডালে গিয়ে বসল। এরপর মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল কিছুতেই সে শিয়ালের চক্রান্তের ফাঁদে পা দেবে না।
যাহোক, শিয়াল যখন দেখলো মোরগ তার নাগালের বাইরে চলে গেছে তখন সে কথার মারপ্যাঁচে মোরগকে বাগে আনার পরিকল্পনা করলো। মোরগকে উদ্দেশ্য করে সে মিষ্টি ভাষায় বলতে লাগলো : আরে, কি ব্যাপার! আমাকে দেখে গাছে উঠলে কেন? তোমার মিষ্টি আওয়াজ শুনে আমি তোমার সাথে বন্ধুত্ব করতে এলাম আর তুমি কিনা আমার কাছ থেকে দূরে চলে গেলে! কতইনা ভাল হতো যদি আমরা একসাথে এ মাঠে ঘুরে বেড়াতে পারতাম!!

মোরগ বলল:  তুমি ঠিক কথাই বলেছো, এত সুন্দর পরিবেশে তোমার সাথে ঘুরতে পারলে আমারো ভাল লাগতো। কিন্তু তো তোমাকে আমি চিনি না। তাছাড়া আমার বাবা আমাকে সব সময় উপদেশ দিতেন অপরিচিত কারো সাথে যেন বন্ধুত্ব না করি।
শিয়াল বলল : আমি তোমার অপরিচিত কে বললো? আমি তো তোমার বাবার বন্ধু। তুমি যখন ছোট ছিলে তখন প্রায় প্রতিদিনই আমি তোমাদের বাসায় যেতাম। এইতো গতকালও তোমার বাবার সাথে আমার দেখা হয়েছিল। তিনি আমাকে বলেছেন, আমি যেন তোমার ব্যাপারে সতর্ক থাকি কেউ যাতে তোমার দিকে চোখ তুলে তাকাতে না পারে।

শেয়ালের কথা শুনে মোরক অবাক হয়ে গেল। কারণ তার বাবা অনেকদিন আগেই মারা গেছে। তাই সে বিস্মিত হয়ে বলল : তুমি এসব কি বলছো! আমার বাবা তো মারা গেছেন বছরখানেক আগে। তুমি নির্ঘাত মিথ্যা বলছো।

মোরগের কাছে মিথ্যা ধরা পরার পর শিয়াল কিছুটা বিব্রতবোধ করলো। তারপর স্বভাবসূলভ ভাষায় কথা ঘুরিয়ে সে বললো : দেখো দেখি কাণ্ড! আমি আসলে তোমার মায়ের কথা বলতে চেয়েছিলাম। তিনিই আমাকে বলেছেন, তোমাকে যেন একা না রাখি। এখন তুমি যদি আমার সাথে চলতে না চাও তাহলে অন্য কথা।

মোরগ বলল: তোমার ব্যাপারে আমি বাবা-মা কারো কাছেই কোন কথা শুনিনি। তবে আমি জানি যে, মোরগ ও শিয়ালের বন্ধুত্ব করা উচিত নয়। কারণ শিয়াল সবসময় মোরগকে খাওয়ার জন্য ব্যস্ত থাকে। আমার মতে, কোন মোরগেরই শিয়ালের মতো শত্রুর সাথে বন্ধুত্ব করা উচিত নয়।

শিয়াল বলল:  হায়! হায়!! তুমি আমাকে শত্রু বললে! আরে তুমি দেখছি কোন খবরই রাখো না। কয়েকদিন আগে বনের রাজা আদেশ দিয়েছেন, সকল জীবজন্তুর মধ্যে যেন বন্ধুত্ব থাকে, কেউ যেন কারো সাথে শত্রুতা না রাখে। তুমি শুনে অবাক হবে যে, রাজার এ ঘোষণার পর এ জঙ্গলে বাঘ ও ভেড়াও বন্ধু হয়ে গেছে! আর তুমি কিনা চাচ্ছো শত্রুতা সৃস্টি করতে!!

শিয়াল যখন এসব কথা বানিয়ে বানিয়ে বলছিল, মোরগ তখন দূরে মাঠের দিকে তাকিয়ে কি যেন দেখছিল। এ দৃশ্য দেখে শিয়াল বললো: ওদিকে তাকিয়ে কি দেখছো? তোমার কি এখানে মন নেই?

মোরগ বলল:  মন কি খালি একখানে রাখলেই চলবে? আরো সামনের দিকে একটু তাকিয়ে দেখো। ওই যে একটি প্রাণী দেখতে এদিকে দৌড়ে এগিয়ে আসছে। জানি না ওটা কোন্‌ প্রাণী। তবে তোমার চেয়ে একটু বড়, লম্বা কান ও লম্বা লেজ দেখতে পাচ্ছি। পাগুলোও লম্বা ও চিকন।

এ কথা শুনে শিয়াল খুব ভয় পেয়ে গেল। মোরগকে খাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়ে সেখান থেকে পালানোর চিন্তা করতে লাগলো। এরপর সে আস্তে আস্তে একটি ঝোপের দিকে রওনা হলো। এ দৃশ্য দেখে মোরগ মিটমিট করে হাসতে লাগলো। শিয়ালকে উদ্দেশ্য করে সে বললো : আরে তুমি যাচ্ছে কোথায়? ওই প্রাণীটা আসার পর্যন্ত অপেক্ষা কর। হতে পারে সে তোমারই মতো কোন শিয়াল।

শিয়াল বলল:  শিয়াল না ছাই! তুমি যে বর্ণনা দিয়েছো তাতে আমার বুঝতে বাকী নেই যে, ওটা একটা কুকুর। আর কুকুর যদি আমাকে নাগালে পায় তাহলে আমার খবর আছে!

মোরগ বলল:  তা হতে যাবে কেন? তুমি না একটু আগে বললে যে, বনের রাজা একে অপরের সাথে সাথে বন্ধুত্ব রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। এ নির্দেশের পর বাঘ ও ভেড়াও নাকি একে অপরের বন্ধু হয়ে গেছে।

শিয়াল বলল:  হ্যাঁ বলেছি, তবে আমার ভয় হচ্ছে এ কুকুরটিও হয়তো তোমার মতো- বনের রাজার আদেশ শুনেনি। তাই আমার এখানে থাকা একটুও নিরাপদ নয়।

এ কথা বলে শিয়াল দ্রুত ওই স্থান ত্যাগ করলো। শিয়াল চলে যাওয়ার পর মোরগ নিজের বুদ্ধির তারিফ করতে লাগলো এবং নিজেকে বাঁচাতে পেরে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

বন্ধুরা,  ছোট্ট মোরগের বুদ্ধির কথা তো শুনলো।  এবারো তোমাদেরকে একটা প্রশ্ন করি। আচ্ছা বলতো, বুদ্ধি কোথায় থাকে? কি বললে- ব্রেইনে! তোমরা একদম ঠিক বলেছো। কিন্তু একটা মানুষের ব্রেইন বা মস্তিস্কে কী পরিমাণু বুদ্ধি থাকে কিংবা মস্তিস্কে কি কি আছে তা কি তোমরা জানো? আমরা বুঝতে পেরেছি তোমরা এ ব্যাপারে খুব বেশী জানো না। ঠিকাছে, এ পর্যায়ে আমরা মানব মস্তিস্ক সম্পর্কেই কিছু জানা-অজানা তথ্য তোমাদের জানাচ্ছি।

আমাদের দেহের ভিতর মাত্র তিন পাউন্ড ওজনের মস্তিস্কের গঠন সবচেয়ে জটিল। এমনি পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ আবিষ্কার কম্পিউটারের চেয়ে হাজার হাজার কোটি গুণ জটিল। ডাক্তার ওয়াল্টারের মতে, বৈজ্ঞানিক প্রণালীতে মানুষের মত সমান ক্ষমতার একটি বৈদ্যুতিক বা এটমিক মস্তিস্ক তৈরি করতে চাইলে যে পরিমাণ টাকা প্রয়োজন হবে দিয়ে বর্তমান সময়ের অত্যাধুনিক প্রায় দশ হাজার কোটি কম্পিউটার কেনা সম্ভব। এই থামো, শরীরে একটু চিমটি কেটে দেখোতো স্বপ্ন দেখছো কিনা? কিন্তু এখানেই কিন্তু শেষ নয়। আরো মজার খবর হচ্ছে, এই মস্তিষ্ককে চালাতে এক হাজার কোটি কিলোওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হবে। দৈনিক চালু রাখার জন্যে প্রয়োজন হবে কর্নফুলির কাপ্তাইয়ের মতো তিন হাজার আড়াইশত বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সামগ্রিক উৎপাদন। সাবধান! তোমরা কিন্তু ভয় পেয়ে যেও না, এই যান্ত্রিক মস্তিস্কের আয়তন হবে আঠারোটি একশ’ তলা বিল্ডিংয়ের সমান।

আমাদের মস্তিষ্কের সবচেয়ে ওপরের সাদা ঢেউ খেলানো অংশকে কর্টেক্স বলে। স্তরে স্তরে বিন্যস্ত এই কর্টেক্সকে সমান্তরালভাবে সাজালে এর আয়তন হবে দু’হাজার বর্গমাইলেরও বেশি অর্থাৎ প্রায় ব্রুনাই দেশের সমান। চৌদ্দশত কোটি নিরপেক্ষ জীবকোষ দিয়ে কর্টেক্স গঠিত। এ সকল পরস্পর বিচ্ছিন্ন সম্পূর্ণ একক জীবকোষকে নিউরন বলা হয়। এগুলি  এতই ক্ষুদ্র যে কয়েকশত একত্রে একটি আলপিনের মাথায় স্থান নিতে পারে। প্রতি সেকেন্ডেই শত শত হাজার হাজার নিউরন এসে ব্রেইনের প্রাথমিক স্তরে জমা হতে থাকে। এরা একেকটি ইলেক্ট্রনিক সিগনাল যা শরীরের বিভিন্ন অংশের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে এবং মূল নিয়ন্ত্রণের আদেশ অতি দ্রুত হাজার কোটি সেলে ছড়িয়ে দেয়। ব্রেইনের এ সকল প্রতিক্রিয়া অনেক সময় সেকেন্ডের দশ লক্ষ ভাগের মাত্র একভাগ সময়ে ঘটতে পারে।

আমাদের দেহের মেরুদণ্ডের মাধ্যমে নিউরনগুলো সারা শরীরের যন্ত্রপাতিগুলোকে সজীব ও তৎপর রাখে। এগুলোর আবার অনেক স্বতন্ত্র বিভাগ রয়েছে যার সংখ্যা প্রায় ২৫০টি। যেমন কোন অংশ শোনার জন্যে, কোন অংশ বলার জন্য, কোন অংশ দেখার জন্য আবার কোন অংশ অনুভূতিগুলিকে কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল  টাওয়ারে ট্রান্সমিট করার জন্যে ব্যস্ত থাকে। এতে আবার বসানো হয়েছে একটি স্বয়ংক্রিয় শক্তিশালী  ‘মেমোরি সেল’। যার কাজ হলো নিত্য নতুন সংগ্রহ গুলিকে যথাযথভাবে সংরক্ষন করা এবং প্রয়োজনের সময় তাকে ‘রি ওয়াইন্ড’ করে মেমোরি গুলিকে সামনে নিয়ে আসা। এই স্মৃতি সংরক্ষণশালা প্রতি সেকেন্ড ১০টি নতুন বস্তুকে স্থান করে দিতে পারে। পরম আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, পৃথিবীর সর্বকালের সর্ব ধরনের যাবতীয় তথ্য ও তত্ত্বকে একত্র করে এক জায়গায় করে যদি এই মেমোরি সেলে রাখা যায় তাতে এর লক্ষ ভাগের একভাগ জায়গাও পূরণ হবে না। সুবহানআল্লাহ ! আমরা আল্লাহর এ মহিমার শুকরিয়া কিভাবে আদায় করবো ভেবে কূলকিনারা পাই না।

বন্ধুরা, তোমরা কি অনুমান করতে পারছো, কত শক্তিশালী আমাদের এ মস্তিষ্ক! তবে দুঃখের বিষয়, আমরা এর হাজার ভাগের একভাগও কাজে লাগাতে পারি না। আধুনিক বিজ্ঞান এ নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করছে। হয়তো অদূর ভবিষ্যতে আমাদের প্রত্যেকের আল্লাহ প্রদত্ত এই মহাশক্তিশালী কম্পিউটারকে কাজে লাগাতে পারবো।

সৌজন্যেঃ রেডিও তেহরান ।