সেপ্টেম্বর ২৪, শুক্রবার, ২০২১

হীরামন

একটি অনুজ অনলাইন ম্যাগাজিন(০ থেকে ১৭ বছরের শিশু-কিশোরদের জন্য )

ফিলিস্তিনী শিশু-কিশোরদের প্রতি সংহতি দিবস

আজ আমরা পৃথিবীর এমন এক জনপদের কথা বলবো-যেখানকার শিশুরা ভাল নেই। তারা তোমাদের মত সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ তো পাচ্ছেই না বরং প্রতিনিয়ত ভয় ও আতঙ্কের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠছে। তাদের কেউ কেউ বড় হবার সুযোগই পাচ্ছে না। তার আগেই হায়েনার গুলি তাদের মূল্যবান প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। তাদের কারো পিতা নেই, কারো মা নেই ; কারো আবার ভাই কিংবা বোন নেই। আবার অনেকের দুনিয়াতে আপন বলতে কেউ নেই। পাঠক! আপনারা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন যে, আমরা ফিলিস্তিনী শিশু-কিশোরদের কথা বলছি। হ্যাঁ, আপনারা ঠিকই ধরেছেন। বর্তমান দুনিয়ায় তাদের চেয়ে দুর্ভাগা আর কারা আছে বলুন! অথচ তাদের এ অবস্থার জন্য তারা মোটেই দায়ী নয়। দায়ী- আমেরিকা, বৃটেনসহ বিশ্বের কয়েকটি বড় দেশ-যারা ফিলিস্তিনকে দখল করতে ইসরাইলকে সাহায্য করেছে এবং এখনও ইসরাইলের সকল অপকর্মের প্রতি সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে।

গোটা ফিলিস্তিনে এখন খাবার নেই, পোশাক নেই, ওষুধ নেই, মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, দু’মুঠো খাদ্যের সংস্থানের মতো কোনও কাজ নেই, আর যারা কাজ করে তাদের পারিশ্রমিক নেই। গাজাসহ পুরো ফিলিস্তিন এখন অবরুদ্ধ, অসহায় ও নিরুপায় । এ অবস্থায় ফিলিস্তিনের প্রতি বিশ্ববাসীর বিশেষকরে মুসলমানদের সাহায্য ও সমর্থন খুবই জরুরী। তোমরা যারা ছোট তাদের কর্তব্য হচ্ছে,ফিলিস্তিনী শিশু-কিশোরদের প্রতি সমর্থন, সমবেদনা ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া। প্রতিদিন তাদের কথা ভাবতে না পারলেও বছরের অন্তত একটি দিন তাদের কথা ভাবতে হবে, তাদের দুঃখ-কষ্টে শরীক হতে হবে। আর এ কাজটি করার জন্য প্রতি বছর ১লা অক্টোবর পালিত হয় ‘ফিলিস্তিনী শিশু-কিশোরদের প্রতি সংহতি দিবস।’ এ দিনটি উপলক্ষে আমরা একটি বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করেছি।অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের দু’জন বন্ধুও অংশ নিয়েছে।

ইহুদীবাদী ইসরাইল ১৯৪৮ সাল থেকে ফিলিস্তিনকে দখল করে রেখেছে। তাদের এ অবৈধ দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে যারাই প্রতিবাদ জানিয়েছে তাদেরকে হত্যা কিংবা কারাগারে বন্দী করা হয়েছে এখনও তা অব্যাহত রয়েছে। বিষ্ময়কর হলেও সত্য যে, ইসরাইলী সেনাদের হামলা থেকে নিষ্পাপ শিশুরাও রেহাই পায় না। গাজার সাম্প্রতিক যুদ্ধেই প্রায় ৪শ শিশু মারা গেছে-যাদের সবার বয়স দশ বছরের কম। এ নিয়ে ২০০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার ফিলিস্তিনী শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া দখলদার ইসরাইলের কারাগারে বর্তমানে প্রায় এক হাজার ফিলিস্তিনী শিশু আটক রয়েছে। ফিলিস্তিনের বন্দি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র একজন মুখপাত্র বলেছেন,দুই হাজার সালে দ্বিতীয় ইন্তিফাদা বা গণ-আন্দোলন শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ইসরাইলী সেনারা প্রায় ৮ হাজার ফিলিস্তিনী শিশুকে আটক করেছে এবং এর মধ্যে প্রায় একহাজার শিশু এখনও ইসরাইলী কারাগারে মানবেতর জীবনযাপন করছে।

এবার আমরা এমন এক ফিলিস্তিনী বন্দীর কথা শোনাবো যার বয়স মাত্র সাত মাস ! ইসরাইলের কারাগারে আটক ফিলিস্তিনী বন্দীদের সে-ই সবচেয়ে কম বয়সী। বর্বর ইসরাইলী সেনারা ৭ মাসের শিশু ইউসুফ আযযাক- এর মাকে গর্ভবতী অবস্থায় গাজার বেইত হানুন ক্রসিং এর কাছ থেকে ধরে নিয়ে যায়। পরে ইসরাইলী কারাগারে ইউসুফের জন্ম হয় এবং ঐ নবজাতক গত সাত মাস ধরে ইহুদীবাদী কারাগারে বন্দী রয়েছে। ইউসুফের পিতা আবু মাহমুদ আযযাক অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বলেছেন,”আমার ইউসুফ ইসরাইলী বন্দীশালায় জন্মগ্রহণ করেছে এবং জন্মের এতদিন পরও আমি আমার সন্তানের মুখ দেখতে পাই নি।”

সাত মাসের শিশু বন্দী ইউসুফ আযযাকের বাবার কথা শুনে মন খারাপ হলেও আশার কথা হচ্ছে, ইসরাইলী সেনারা হত্যা, নির্যাতন, অবরোধ, জেল-জুলম ইত্যাদির মাধ্যমেও ফিলিস্তিনিদের আন্দোলন দমাতে পারেনি। এবার আমরা ১৩ বছরের এক দুঃসাহসী ফিলিস্তিনীর কাহিনী শোনাবো। ২০০০ সালের ২৯ অক্টোবর ফারিস উদেহ নামের ঐ শিশুটি গাজার কারনি ক্রসিং-এর কাছে ইসরাইলী একটি ট্যাঙ্কের সামনে পাথর হাতে দাঁড়িয়ে যায়। ট্যাংক লক্ষ্য করে পাথরটা ছুঁড়ে গাজার ওই কিশোর ইসরাইলীদের জানিয়ে দেয়, ‘তোমাদের অস্ত্রের চেয়ে আমাদের সাহস অনেক শক্তিশালী।’ এ দৃশ্যটি ক্যামেরায় ধারণ করেন বার্তা সংস্থা এপির ফটোগ্রাফার লরেন্ট রেবুর্স। অসীম সাহসী ঐ শিশুর ছবিটি সে সময় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। কিন্তু ইসরাইলী সেনারা ঐ ঘটনার ১০ দিন পর ফারিস উদেহকে খুঁজে বের করে এবং গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করে।

এ পর্যায়ে আমরা এমন এক শিশুর শাহাদাতের কাহিনী শোনাবো-যার মৃত্যুর কাহিনী নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়েছে। ২০০০ সালের ৩০শে সেপ্টেম্বর দুপুর বেলায় জামাল আদ্‌ দোরা নামের ১০ বছর বয়সী এক শিশু যখন তার পিতার সাথে বাড়ি ফিরছিলেন তখন ইসরাইলী সেনাদের সাথে ফিলিস্তিনী যোদ্ধাদের সংঘর্ষ চলছিল। তারা যখন গাজা উপত্যকার নেটজারিম জংশন এলাকায় পৌছে তখন ইসরাইলী সেনাদের সামনে পড়ে যায়। আদ দোরাকে বাঁচানোর জন্য তার পিতা একটি দেয়ালের পাশে অবস্থান নেয় । ইসরাইলী সেনাদের ভয়ে আদ দোরা তার পিতার পেছনে লুকায়। কিন্তু তারপরও পাষন্ড ইসরাইলী সেনারা তাকে গুলি করে হত্যা করে। এ সময় সন্তানকে বাঁচাতে গিয়ে পিতাও গুলিবিদ্ধ হন। পিতার সামনেই নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করা হয় ১০ বছর বয়সী পুত্রকে। সেদিন তাদের চিৎকারে আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে উঠলেও ইসরাইলী সেনাদের মনে এতটুকু দয়ার উদ্রেক হয়নি।

ইসরাইলের জবর দখল, মানবতাবিরোধী নীতি ও অপকর্মের কারণেই আজ ইসরাইল ও ফিলিস্তিনী শিশুদের মধ্যেও বৈষম্য দেখা দিয়েছে। ফিলিস্তিনের বিখ্যাত কবি মাহমুদ দারউইশ তার কবিতায় এক ইহুদী বালকের প্রতি এক ফিলিস্তিনী বালকের আর্তনাদপূর্ণ আহ্বান ফুটে তুলেছেন। তিনি লিখেছেন-

‘তুমি চাইলেই সোনালি রোদে খেলা করতে পার,
তুমি চাইলেই পাও উজ্জ্বল পুতুল, কিন্তু আমার তা নেই।
তোমার আছে ঘর, আমার কিছুই নেই।
তোমার আছে উৎসব আর উদযাপন, কিন্তু আমি তার দেখা পাই না।

ফিলিস্তিনে যেসব শিশু নিহত হচ্ছে তারা আমাদেরই ভাই। তাই তাদের দুঃখ-কষ্টে শরীক হওয়া বিশেষ করে তাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি সমর্থন জানানো আমাদের সবার কর্তব্য।

উৎসঃ “রেডিও তেহরান” এর মাধ্যমে প্রকাশিত ।