সেপ্টেম্বর ২৪, শুক্রবার, ২০২১

হীরামন

একটি অনুজ অনলাইন ম্যাগাজিন(০ থেকে ১৭ বছরের শিশু-কিশোরদের জন্য )

টেলিভিশনে সহিংসতা ও শিশু কিশোরদের মনোজগৎ

শিশু-কিশোরের প্রতীক হলো নতুন কুঁড়ি। ফুলের পাপড়ি মেলার মতো সৌন্দর্য ছড়িয়ে বড় হয় সে। শিশুর হাসিতে বাড়ির আবহ পাল্টে যায়। মায়াময় পরিবেশ তৈরি হয় ঘরের ভেতর। এই সুন্দরের মাঝেও পড়তে পারে অসুন্দরের ছাপ। যে সব শিশু টিভি কিংবা কম্পিউটারের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকে মারদাঙ্গা ছবি, কার্টুন, খুনোখুনি কিংবা সহিংসতা দেখে তাদের নরম মনেও হিংস্রতার ছাপ পড়তে পারে। বড় হয়ে মারমুখী স্বভাব এবং বেপরোয়া আচরণও করতে পারে। শুধু নাটক সিনেমা নয়, টেলিভিশনের সংবাদেও দেখা যায় এ সহিংসতা।

আধো আধো বোল ফোটার পর থেকে ধীরে ধীরে হেলেদুলে টলতে টলতে হাঁটতে থাকে শিশু। যা দেখে তাই অনুকরণ করে, সহিংস মারমুখী ছবি দেখায় আকৃষ্ট হয়ে যেতে পারে, আকর্ষণ ক্রমে ক্রমে শিশুটির ভেতর উৎসাহ জাগতে পারে, অভ্যস্ত হয়ে যেতে পারে সে। অভ্যাস থেকে উৎসাহ জোরাল হয়ে যায়। উৎসাহ এবং অভ্যাসের যৌথ ধারা শিশুর মাঝে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। ফলে সুখী পারিবারিক আবহের ভেতর থেকেও শিশুটির মনোজগতে ঘটে যেতে থাকবে পরিবর্তন। নিজের ভেতর রোপণ করে নিতে পারে সে হিংস্র আচরণের বীজ। সবার চোখের সামনে দিয়ে সে এভাবে হয়ে উঠতে পারে ভিন্ন প্রকৃতির দুর্ধর্ষ এক শিশু। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সময়কালও শিশুর সামগ্রিক বেড়ে ওঠার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। টেলিভিশনের স্ক্রিনে দেখানো প্রিয় চরিত্রটির সব ধরনের বৈশিষ্ট্য এরা অনুকরণ করে। যদি চারিত্রটি হয় দুঃসাহসী মারদাঙ্গা বিজয়ী কোনো নায়কের, কিংবা কার্টুনে অভিনীত চরিত্রটি যদি সহিংস কোনো আচরণের জন্য বাহবা পায়, সেই বাহবা শিশুর কাছে হিরোর মর্যাদা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এমন ধরনের বাহবা আদায়ের জন্য সুপ্ত ইচ্ছাও তার ভেতর গেড়ে বসতে পারে, ভবিষ্যতে হিংস্র আচরণ নিয়ে বড় হয়ে উঠতে পারে সে। কৈশোরের প্রভাব একইরকম। সহিংস বিজয়ীর আচরণ কল্পনায় উপভোগ করতে পারে। ভাবতে ভাবতে নিজের মধ্যে সমস্যা তৈরি করে ফেলতে পারে, কিশোরীদের মধ্যেই এর প্রভাব বেশি।

টেলিভিশন ও হিংস্র আচরণের মধ্যে কোনো সম্পর্ক আছে কিনা বের করার জন্য ১৭ বছর গবেষণা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের মনোগবেষক জেফরি জনসন। যে সব শিশু-কিশোর দৈনিক তিন ঘণ্টার বেশি টিভি দেখে তাদের মধ্যে ১০০ জনের মধ্যে প্রায় ২৯ জনই মারমুখী হয়ে যায়। তিনি বাবা-মায়েদের উদ্দেশে বলেছেন, শিশুদের দৈনিক এক ঘণ্টার বেশি টিভি দেখতে দেওয়া উচিত নয়। ইদানীং ছবি কিংবা কার্টুনে ঠাসা থাকে মারপিট, দুর্ধর্ষ হিংস্রতা। সহিংসতা দেখে দেখেই এভাবে সমাজে বেপরোয়া, হিংস্র ও সন্ত্রাসী শিশু তৈরি হতে পারে। এরা অন্য শিশুদের নিপীড়ন বা নির্যাতন করতে পারে। নির্যাতিত শিশুরাও বড় হয়ে নিপীড়নকারী বনে যেতে পারে। অবশ্য শিশু নিপীড়নের আরও অনেক কারণ রয়েছে। সুতরাং বাবা-মার উচিত বুঝেশুনে শিশুকে টিভি দেখতে দেওয়া, টিভি নিয়ন্ত্রণ করা। কেন নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে তা শিশুর বোধের ভেতর জাগিয়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক : ডা. মোহিত কামাল

সাইকিয়াট্রিস্ট ও সাইকোথেরাপিস্ট,

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট,শেরেবাংলানগর,ঢাকা

“বাংলাদেশ প্রতিদিন” এর সৌজন্যে